Showing posts with label ভূতের গল্প. Show all posts

Monday, October 15, 2018

ভূতের গল্প - রহস্যময় লোকটি

রহস্যময় লোকটি

স্লামালাইকুম ভাই, একটু সরবেন ওই সিটটা আমার।
তাকিয়ে দেখি কালো, রোগা মত অদ্ভূত দর্শনের একজন লোক আমার পাশের সিট টাকে ইঙ্গিত করে দাঁড়িয়ে আছে। তাড়াতাড়ি সালামের জবাব দিয়ে সরে তাকে ভেতরে ঢোকার জন্য জায়গা করে দিলাম। ঢোকার সময় লোকটার গায়ে হাত লাগার পর তার শরীরটা কেমন যেন ঠান্ডা ঠান্ডা লাগল। একটু ভয় পেয়ে গেলাম। লোকটা মনে হয় ব্যাপারটা বুঝতে পারল এবং রহস্যময় মুচকি একটা হাসি দিল। আমি কিছুক্ষণ লোকটার দিকে তাকিয়ে অন্য পাশে ফিরে বসলাম। বাসটা ছেড়ে দিল।
অনেকদিন পর নানার বাড়িতে যাচ্ছি। বিভিন্ন সমস্যার কারনে মাঝখানে কয়েক বছর যাওয়া হয় নি। এবার একটা বড় ধরনের ছুটি পাওয়ার ফলে রওনা দিলাম। বাড়িতে নানা-নানী আর দূর সম্পর্কের দুইজন মামাতো ভাই ছাড়া কেউ থাকে না। আগে অনেক লোকজন থাকত। আমরাও বিভিন্ন সময় সেখানে চলে যেতাম। সেইসব স্মৃতি মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে যায়। কত মজাই না করতাম।
-ভাই কি নানার বাড়ি যাচ্ছেন?
হঠাৎ লোকটা প্রশ্ন করে বসল। কিছুটা অবাক হয়ে জবাব দিলাম,
-জি, আপনি কি করে বুঝলেন?
-না আপনাকে ওই বাড়িতে দুই একবার দেখছি বলে মনে হচ্ছে। আপনার নানার নাম করিম উদ্দিন ভূঁইয়া না?
-জি, আপনি আমার নানাকে চেনেন?
-আগে প্রায় সময় ওই বাড়িতে যেতাম, এখন আর যাওয়া হয় না।
মনে মনে ভাবলাম বাড়িতে তখন অনেক লোকই আসত, সবাইকে তো আর চেনা সম্ভব না। ওদের মধ্যে কেউ একজন হবে আর কি। এমন সময় বিভিন্ন দিক থেকে হর্ণের শব্দ কানে আসতে শুরু করল। তাকিয়ে দেখি সামনে বিশাল জ্যাম লেগে গিয়েছে। আজকে মনে হয় বাড়ি যেতে অনেক রাত হয়ে যাবে।
-আপনার নাম কি?
-আমার নাম সগির। আপনার নানাদের পাশের গ্রামে থাকতাম।
-থাকতাম মানে, এখন আর থাকেন না?
-নাহ।
বলে লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর হুট করে একটা কথা জিজ্ঞেস করে বসল,
-আপনি কি জিন-ভূতে বিশ্বাস করেন?
হঠাৎ এই ধরনের প্রশ্ন করায় একটু অবাক হলাম।
-না, কিন্তু হঠাৎ এইগুলা জিজ্ঞেস করতেছেন কেন?
-ও আপনি মনে হয় আপনার নানার বাড়ির সামনের বাঁশঝাড় টার কথা শোনেন নাই।
-না, ওই বাঁশঝাড়ের আবার কি হইল?
কিছুটা অবাক হলাম।
-আছে, ওইটা সম্পর্কে বিরাট এক কাহিনী আছে। ওই কাহিনী শুনলে জিন-ভূতে বিশ্বাস করা শুরু করবেন।
মনে মনে ভাবলাম, প্রত্যেক গ্রামেই এ ধরনের কিছু কাহিনী প্রচলিত থাকে। এগুলো বিশ্বাস করার কোন মানে হয় না।
-আপনার যদি সমস্যা না থাকে তাহলে বলতে পারেন।
-আচ্ছা বলি তাহলে, এই কাহিনীটা ঘটছিল আমার নিজের জীবনে।
এরপর লোকটা তার কাহিনী বলা শুরু করল,
আমাদের গ্রামের এক বাড়িতে ১৬ বছর বয়সী একজন যুবতী মেয়ে থাকত। বাড়িতে তার সাথে তার বাবা মা আর ছোট একটা ভাই থাকত। মেয়েটি দেখতে বেশ সুন্দরী ছিল। যার ফলে প্রায় সময় গ্রামের বখাটে ছেলেরা তাকে বিরক্ত করত। একবার অন্য গ্রাম থেকে আসা এক ছেলে তাকে প্রেমের প্রস্তাব করে। কিন্তু মেয়েটা তার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়, যার ফলে ছেলেটা তাকে স্কুলে যাওয়ার পথে এবং বিভিন্ন সময় দেখা হলেই বিরক্ত করত।
একবার ওই ছেলেটা দলবল নিয়ে গ্রামে এসে মেয়েটাকে রাস্তা থেকে ধরে ওই বাঁশঝাড়ে নিয়ে যায়। সেখানে তারা মেয়েটাকে ধর্ষণ করে। এরপর তারা মেয়েটাকে মেরে ফেলে এবং সেখানেই ফেলে রেখে চলে যায়। পরদিন ওই জায়গা থেকে মেয়েটার লাশ উদ্ধার করা হয়, এবং ঈমাম সাহেবের ফতোয়া অনুযায়ী জানাজা ছাড়াই কবর দেওয়া হয়। এর আগে পুলিশের লোকজন এসে দেখে যায়, কিন্তু তারা কিছুই করতে পারে না। এই ঘটনার পর মেয়েটার পরিবার ওদের ঘরবাড়ি ফেলে অন্য কোথাও চলে যায়।
লোকটা একবারও না থেমে বলে যেতে থাকে,
তখন থেকেই গ্রামের লোকজন বলাবলি করতে থাকে ওই বাঁশঝাড়ে নাকি প্রায় সময় একটা মেয়েকে একা বসে কাঁদতে দেখা যায় এবং যুবক ছেলে দেখলেই ধরে নিয়ে যায়। তাই লোকজন রাতের বেলা ওই রাস্তাটা খুব একটা বেশি দরকার না হলে ব্যবহার করত না। আমার বয়স তখন খুব একটা বেশি ছিল না, তাই সবাই আমাকে ওই জায়গা দিয়ে চলতে নিষেধ করত। কিন্তু আমি এসব বিষয়কে খুব একটা পাত্তা দিতাম না। এগুলোকে গুজব বলেই মনে করতাম। তারপরও ওই জায়গা দিয়ে খুব একটা যেতাম না।
এক রাতের ঘটনা, এখনো পুরোপুরি মনে আছে। সেরাতে আমি বাজার করে বাড়ি ফিরছিলাম। ফেরার সময় ভাবলাম আপনার নানার বাড়ি থেকে ঘুরে যাই। তখন ওই রাস্তাটা দিয়ে রওনা দিলাম। যদিও ভূত-পেত্নিতে খুব একটা বিশ্বাস করতাম না, তারপরও ওইদিন একটু ভয় ভয় করছিল। আকাশে চাঁদের আলো ছিল বলে টর্চ টা জ্বালানোর প্রয়োজন বোধ করলাম না। চলার পথেই একটা কুকুর দেখতে পেলাম। কুকুরটাকে দেখেই মনে মনে একটু শান্তি পেলাম, যাক আমি ছাড়াও একটা জীবিত প্রাণী আছে। কুকুর টাও কি ভেবে আমার পিছু পিছু আসতে শুরু করল। তখন কিছুই বুঝি নাই, ভাবছিলাম কুকুরটা আমার বাজার করা জিনিসগুলোর লোভেই পিছু পিছু আসছে। আর কুকুরটা সাথে আছে বলে সাহসটাও একটু বেড়ে গিয়েছিল, তাই আর পাত্তা দেই নাই। কিছুদূর যাওয়ার পর যখন বাঁশঝাড় টার কাছে আসলাম তখন হঠাৎ করে কার যেন হাসির শব্দ কানে বাজল।
এইবার একটু আগ্রহ বোধ করলাম। একটু ভয় ভয়ও লাগতে শুরু করল। ওই রাস্তা দিয়েই তো আমাকে বাড়ি যেতে হবে। লোকটা না থেমে বলে যেতে লাগল,
এই জায়গায় এত রাতে কে হাসাহাসি করতে যাবে? ভাবতেই বুকটা একটু কেঁপে উঠল। পরক্ষণেই দেখি বাঁশঝাড় টার তলায় একটা মেয়ে বসে কান্না করছে। সাথে সাথে ভয়ে পুরোপুরি জমে গেলাম। তখন খেয়াল হল তাড়াতাড়ি এখান থেকে চলে যাওয়া উচিৎ। কিন্তু কিছুতেই পা নাড়াতে পারছিলাম না, মনে হল কেউ যেন আটকে রেখেছে। কুকুরটা তখনো আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। একটু পর লক্ষ্য করলাম মেয়েটা উঠে দাঁড়াল, এবং হাতের ইশারা দিয়ে আমাকে ডাকতে শুরু করল। অদ্ভূত একটা আকর্ষণ অনুভব করলাম নিজের ভেতর। এবং সম্মোহিতের মত তার দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। আমার আগমন দেখে মেয়েটা হাঁটা শুরু করল, আমিও একইভাবে তার পিছু হাঁটতে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতে কতদূর পর্যন্ত গিয়েছি খেয়াল ছিল না। আসলে কোন দিকেই খেয়াল ছিল না। মনে হচ্ছিল আমাকে সম্মোহন করে রাখা হয়েছে। একসময় একটা পরিত্যক্ত বাড়ির সামনে এসে মেয়েটা থামল। এরপর আমাকে বাড়ির ভেতরে ঢোকার নির্দেশ দিল। আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। একটু একটু করে আগানোর চেষ্টা করলাম। এমন সময় দেখলাম একটা কুকুর কোথা থেকে যেন দৌড়ে এসে মেয়েটার উপর ঝাপিয়ে পড়ল, সেই কুকুরটা যেটা আমার পিছু নিয়েছিল। শুরু হয়ে গেল মেয়েটা আর কুকুরটার মাঝে লড়াই। কুকুরটা মেয়েটাকে আঁচড়ে-কামড়ে ছিড়ে ফেলতে চাইছে, মেয়েটাও সমান তালে কুকুরটাকে আঘাত করছে। ততক্ষণে কিছুটা চেতনা ফিরে আসতে শুরু করল। লড়াইটা এক সময় খুব ভয়ংকর হয়ে গেলে আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। তখন জ্ঞান হারিয়ে সেখানেই শুয়ে পড়লাম।
একবার ভাবলাম লোকটা হয়ত বানানো গল্প বলছে, কিন্তু লোকটার চেহারা দেখে ভাবনাটা বাতিল করে দিতে হল। তখনও বলে চলছে।
এরপর আর কিছুই মনে নেই। পরে সকাল হলে যখন ঘুম ভাঙল, তখন দেখলাম অনেকগুলো মুখ আমার দিকে ঝুঁকে রয়েছে। তাড়াতাড়ি উঠে বসার চেষ্টা করলাম, কিন্তু প্রচন্ড দুর্বলতার কারনে উঠতে পারলাম না। কি হয়েছে বুঝার চেষ্টা করতে লাগলাম। পরক্ষণেই গত রাতের কথা মনে পড়ল। তারপর আস্তে আস্তে সব বুঝতে পারলাম।
আমাকে কোন কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ না দিয়ে লোকটা একমনে বলে যেতে লাগল,
এরপর একটু সুস্থ হওয়ার পর বাড়ির লোকজনের কাছ থেকে শুনলাম, তিনদিন নাকি আমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে লোকজন লাগিয়ে অনেক খোঁজাখুঁজির পর ওই মেয়েটার পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে অজ্ঞান অবস্থায় আমাকে পাওয়া যায়। এর একদিন পর সকালে আমার জ্ঞান ফিরে আসে। আর আমি ভাবছিলাম মাত্র একরাত ঘুমিয়েছি। এরপর থেকেই আমার মধ্যে কিছু রহস্যময় আচরণ শুরু হয়।
-কি ধরনের রহস্যময় আচরণ?
এবার সুযোগ পেয়ে লোকটাকে বাধা দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। লোকটা কোন জবাব না দিয়ে রহস্যময় একটা হাসি উপহার দিল। বুঝতে পারলাম লোকটা এ বিষয় নিয়ে আর কিছু বলতে চায় না। এরপর লোকটার সাথে পুরো রাস্তায় আর কথা হয় নি। আমি বিষয়টার ব্যাখ্যা কি হতে পারে তা নিয়ে অনেক্ষণ চিন্তা করতে লাগলাম। কিন্তু চিন্তা করেও কোন ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারলাম না। শেষে ভাবলাম পৃথিবীতে কত রহস্যময় ব্যাপার ঘটে থাকে সব কিছুর ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া সম্ভব না।
বাসটা যখন পৌঁছাল তখন রাত ১০ টা বেজে গিয়েছে। রাস্তায় জ্যামের কারনে বেশি দেরি হয়ে গেছে। এত রাতে একা যেতে হবে ভেবে একটু ভয় ভয় লাগল। তখন লোকটাকে বললাম একসাথে চলেন। তিনি এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। একটু খটকা লাগলেও দুজন মিলে হাঁটা শুরু করলাম। হাঁটতে হাঁটতে খুব একটা কথা হয় নি। একসময় ওনার গল্পের সেই রাস্তার ধারে চলে আসলাম, পাশে লোকটা থাকা সত্ত্বেও ভয়টা একটু বাড়তে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর যখন বাঁশঝাড় টার কাছে আসলাম তখন হঠাৎ দেখলাম খুব সুন্দর চেহারার একজন মেয়ে একটা কুপি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। কুপির কম্পমান শিখা টার কারনে মেয়েটার চেহারাও কেঁপে কেঁপে উঠছে। প্রচন্ড ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেলাম। পরক্ষণেই পাশে তাকিয়ে দেখি আমার সাথের লোকটা নেই। আবার বাঁশঝাড় টার দিকে তাকিয়ে দেখি মেয়েটাও হাওয়া হয়ে গেছে। ভয়ে আতঙ্কে আমার অবস্থা তখন দিশেহারা। তাড়াতাড়ি করে কোনমতে পা চালিয়ে বাড়িতে পৌঁছে গেলাম। বারবার মেয়েটির সুন্দর মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল।
পরে নানাকে জিজ্ঞেস করার পর জানতে পারলাম সগির নামের সেই লোকটিই নাকি মেয়েটাকে ধর্ষণ করার পর হত্যা করেছিল। একদিন ওই পথে যাওয়ার সময় সে রহস্যজনক ভাবে হারিয়ে গিয়েছিল। এরপর থেকে তাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় নি। এবং সে যে কাহিনী শোনাল তার অধিকাংশই নাকি মিথ্যা ছিল। এই কথা শোনার পর বড়সড় একটা ঢোঁক গিললাম। সেইদিন কি তাহলে একটা ভূতের সাথে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি? ভাবতেই কেমন একটা শিরশিরে অনুভূতি হল।
অনেক চিন্তা করেও এই ঘটনার কোন ব্যাখ্যা খুঁজে পেলাম না। পৃথিবীতে কতই না রহস্যময় ব্যাপার ঘটে থাকে।

ভূতের গল্প - সত্য ঘটনা -অদৃশ্য মায়াজাল

সত্য ঘটনা -

দুপুরবেলা বউ আর সাত বছরের মেয়ে তাহেরাকে নিয়ে ভাত খাচ্ছিলেন রমিজ মিয়া। ঠিক তখনই খবর আসে রমিজ মিয়ার চাচা শ্বশুর মারা গেছেন। রমিজ মিয়া খবর শুনে শ্বশুর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন।
রমিজের শ্বশুরবাড়ি ছিল তার বাড়ি থেকে পাঁচ কি ছয় কিলোমিটার দূরে । তাই তিনি বউ আর মেয়েকে একটা ভ্যান গাড়িতে তুলে দিয়ে নিজে সাইকেল নিয়ে যাচ্ছিলেন।গ্রামের কাঁচা রাস্তা তার উপর বর্ষাকাল হওয়ায় রাস্তায় অনেক কাঁদা জমে ছিল।
প্রায় এক ঘন্টা পর গিয়ে শ্বশুর বাড়ি পৌঁছায় রমিজ মিয়া। গোসল তারপর জানাযা শেষে আসরের নামাজের পর লাশ কে কবর দিতে নিয়ে যাওয়ার সময় তাহেরা ওর বাবা রমিজের কাছে বায়না ধরে যে,
সেও কবর দিতে যাবে।
মেয়ের কথায় না করে দিয়ে রমিজ বলেন,
— তুমি ছোট মেয়ে মানুষ, সেখানে গিয়ে কি করবে?
তবে মেয়েটা তার বড্ড জেদি সে যাবে তো যাবেই। অনেক কান্নাকাটি করার পর রমিজ মিয়া তাহেরাকে নিয়ে যেতে রাজি হয়।
তবে তিনি বলেন যে, সে যেন সব সময় তার মামার সাথেই থাকে। তাহেরা রাজি হয়।
গ্রামের শেষ প্রান্তে চাষের জমির ভিতর গোরস্থান।গোরস্তানটির চারদিকে কোন দেয়াল নেই, নেই কোন সীমানাও।
গোরস্থানে এসে রমিজ মিয়া তাহেরাকে ওর মামার কাছে রেখে বলেন,
— এখানে চুপচাপ দাড়িয়ে থাকবা কোথাও যাবেনা। তারপর রমিজ মিয়া লাশটিকে মাটি দিতে কবরের কাছে চলে যান।
কেমন করে লাশকে মাটি দেয় তা দেখার জন্য ভীষণ কৌতুহলী হয়ে যায় তাহেরা। তাই মামাকে কিছু না বলেই মাটি দেয়া দেখবে বলে ওপর পাশ দিয়ে কবরের পাশে গিয়ে যেই না উঁকি দেবে ঠিক তখনই একটা পুরোনো কবর ভেঙে ভিতরে পরে যায় তাহেরা।
তারপর চিৎকার শুরু করে দেয়। রমিজ মিয়া তাড়াতাড়ি মেয়েকে ভাঙা কবর থেকে তুলে বাসায় চলে যান।তারপর মেয়েকে আচ্ছা মত গালি দেন যে,
কেন সে তার কথা শুনলোনা ?
তাহেরার গায়ে যে কাঁদামাটি লেগে ছিল তা ধুয়ে দেন তাহেরার মা।
রাত প্রায় আট টা বাজে। খাওয়ার পর রমিজ মিয়া তার বউকে বলেন,
— আমি তাহলে এখন বাড়ি যাই কারণ গরু-ছাগল আছে আর তুমি মেয়েকে নিয়ে থাকো। কাল সকাল হলে চলে যেও।
রমিজের বউ তাকে চলে যেতে বলেন।
ঠিক তখনই তাহেরা ওর বাবার সাথে বাসায় যাবে বলে বাধ সাধে।
সবাই বলে,
–তুমি মায়ের সাথে থাকো, কাল সকালে যেও।
কিন্তু কে শোনে কার কথা? সে যাবে তো যাবেই।
অবশেষে রমিজ মিয়া মেয়েকে সাইকেলের পিছনে নিয়ে রওনা হন।
বৃষ্টির পানি জমে থাকায় রাস্তাটিতে কাঁদা ভরা। রমিজ মিয়া আস্তে আস্তে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রায় এক কিলোমিটার আসার পর সামনেই একটা বড় মেহগনি গাছের বাগান পরে।আর এর পাশ দিয়েই রাস্তাটা চলে গেছে।মেহগনি গাছের বাগানের কাছে আসতেই হঠাৎ সাইকেলের চেইনটা পরে যায়।
রমিজ মিয়া সাইকেল থেকে নেমে চেইনটি তোলার সময় লক্ষ্ করেন তার পাশ দিয়ে কালো একটা বিড়াল চলে গেল। রমিজ মিয়া বিষয়টা আমলে না নিয়ে আবার সাইকেল চালাতে লাগলেন।
মেহগনি গাছের বাগানটার মাঝে আসতেই আবার সাইকেলের চেইন পরে যায়। রমিজ মিয়া আবার সাইকেল থেকে নেমে চেইনটা তোলার সময় লক্ষ্য করেন সেই কালো বিড়ালটা আবারো তার পাশ দিয়ে চলে গেল।
এবার একটু ঘাবড়ে যান রমিজ মিয়া।
তিনি বুঝে যান যে, এটা স্বাভাবিক কিছু না।
চেইনটা ঠিক করে সাইকেলে উঠবে ঠিক তখনই আবারও লক্ষ্য করেন প্রচণ্ড জোরে হাওয়া বইছে মেহগনি গাছের বাগানে।যেন সামনে এগুতেই পারছেন না। মেয়েকে একহাতে ধরে কোন রকমে সাইকেলটা ঠেলতে ঠেলতে বাগানটার শেষ প্রান্তে আসতেই একটা মেহগনি গাছের ডালের উপর চোখ পরে তার।
তিনি দেখেন, সাদা কাফন পরা একটা মানুষের অবয়ব সেখানে বসে আছে। তবে অবয়বটার মাথা নেই।
ভয়ে কলিজা শুকিয়ে আসে তার।তিনি ভাবেন,
— মেয়ে যদি এটা দেখে তো প্রচন্ড রকমের ভয় পাবে। তাই তিনি মেয়েকে সাইকেলের পিছন থেকে সামনে এনে কোলের ভিতর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলেন,
— মা, তুমি চোখ বন্ধ করে বসে থাকো। আমি না বলা পর্যন্ত চোখ খুলবে না।
তারপর রমিজ মিয়া কোন রকমে সাইকেলটা ঠেলতে ঠেলতে রাস্তা দিয়ে দৌড়াতে থাকেন।
মেহগনি বাগানটা পেরোতেই এখন খোলা মাঠের ভিতর দিয়ে রাস্তা ।রমিজ মিয়া সাইকেল নিয়ে মেয়েকে জাপটে ধরে দৌড়াচ্ছেন ঠিক তখনই দেখতে পান সামনেই পুরো রাস্তা জুড়ে সাদা কাফন পরা একটা লাশ শুয়ে আছে। এটা দেখে অনেক ভয় পেয়ে যান তিনি।তবে তাকে যে ভয় পেলে চলবে না। তাকে যে ভাবেই হোক বাসায় পৌঁছাতেই হবে।রমিজ মিয়া আবারও মেয়েকে বলেন,
— মা, আমি না বলা পর্যন্ত কিন্তু তুমি চোখ খুলবেনা।
এরপর রমিজ মিয়া লক্ষ্য করেন লাশটার পাশ দিয়ে সামান্য একটু জায়গা আছে যেখান দিয়ে সাইকেল চালিয়ে কোন রকমে চলে যাওয়া যাবে। রমিজ মিয়া সাইকেলে উঠে সেই লাশটার পাশ দিয়ে দ্রুত গতিতে সাইকেল নিয়ে পাশ কাটাতেই প্রচন্ড পচা পচা গন্ধ পান।মেয়েটাও তার গন্ধ পেয়ে বলে,
— বাবা এটা কিসের গন্ধ ?
রমিজ মিয়া বলেন,
— ও কিছু না মা। তুমি চোখ বুজে থাকো।
রমিজ মিয়া আর একটু সামনে যেতেই পিছন থেকে তার বৌয়ের গলায় ডাক শুনতে পান।
ডাক শুনেই তার মেয়ে বলে,
— বাবা, মা তোমাকে ডাকছে, মাকেও আমাদের সাথে নিয়ে চলোনা।
রমিজ মিয়া আবার মেয়েকে বলেন,
— নিয়ে যাচ্ছি, তবে তুমি কিন্তু চোখ খুলবে না আমি না বলা অবধি।
এভাবে জোরে জোরে সাইকেল চালিয়ে রমিজ মিয়া তার গ্রামের রাস্তায় চলে আসেন। সেখান দিয়ে যেতে যেতে দেখেন,
পাশের বাশ বাগানের ভিতর থেকে সেই মাথা কাটা লাশটা হাতের ইশারায় তাকে ডাকছে।
রমিজ মিয়া আরো জোরে জোরে সাইকেল চালাতে চালাতে তার বাড়ির কিছুটা কাছে আসতেই একটা লোককে দেখতে পান। তাকে দেখতেই যেন প্রাণ ফিরে পেলেন রমিজ মিয়া। তাড়াতাড়ি লোকটার কাছে চলে যান এবং তাকে তার বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসতে বলেন।পথে লোকটাকে রমিজ মিয়া ঘটনাটা বললে লোকটা তাকে বলে,
— আমিতো মাঝে মাঝেই অনেক রাতে এ পথ দিয়ে যাই। তবে কোনদিন তো কিছু দেখিনি। হয়ত লাশ কবর দিয়ে এসেছেন তাই এমন হয়েছে।
একথা বলেই বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে লোকটি চলে যায়।
ঘরে ঢুকে রমিজ মিয়া লক্ষ্য করেন তার মেয়ের গা দিয়ে কেমন যেন পচা গন্ধ বের হচ্ছে। তিনি ভাবেন,
হয়ত কবরের ভিতর পরে যাওয়ার কারণে এমন হয়েছে।
রমিজ মিয়া তার মেয়েকে বলেন জামা কাপড় খুলতে কারণ তাকে গোসল করতে হবে।
বাবার কথা মতো তাহেরা জামা খুলতেই মেঝেতে একটা ছোট্ট হাড়ের টুকরো পরে যায়। হাড়ের টুকরোটা দেখে সেটা হাতে নিয়ে রমিজ মিয়া বলেন,
— মা, তুমি এটা কোথায় পেলে !
তাহেরা বলে,
— সে যখন কবরের ভিতর পরে গিয়েছিল তখন তার গায়ের উপর এটা পড়েছিল।
আর তখনই সে এটা নিয়ে পকেটে রেখেছিল পরে এটা দিয়ে খেলা করবে বলে।
মেয়ের কথা শুনে রমিজ মিয়া প্রচন্ড রাগে মেয়েকে অনেক বকাঝকা করেন।
আর তাড়াতাড়ি পাশের বাড়ির হুজুরের কাছে চলে যান। হুজুরটি সব শুনে রমিজ মিয়ার থেকে হাড়টি নিয়ে তাকে এক গ্লাস পানি পড়া দেন আর বলেন,
— এটা একটা আঙুলের হাড়। আর এই হাড়টি তোমার মেয়ের সাথে আনার কারণেই পথে তোমাদের সাথে এমনটা হয়েছে। আর তুমি যদি পথে সেই সময় তোমার মেয়েকে চোখ বন্ধ করে না রাখতে বলতে তবে তোমার মেয়ে সেটা দেখে প্রচন্ড ভয় পেতো এমনকি অনেক বড় ক্ষতি ও হতে পারতো।
সব শুনে রমিজ মিয়া সেই পড়া পানি নিয়ে বাড়ি চলে আসেন। তবে ঠিক সেদিন রাতেই রমিজ মিয়া স্বপ্ন দেখেন যে,
তার চাচা শ্বশুরের কবরের পাশের কবরের উপর দাড়িয়ে সেই গলাকাটা লাশটা তাকে বলছে,
” তোর অনেক সাহস, যে কারণে তোর মেয়েকে নিয়ে বেঁচে ফিরতে পারলি। না হলে তোর মেয়েকে আর জ্যন্ত ফিরে পেতি না”

ভূতের গল্প - অদ্ভূত যুবক

অদ্ভুত যুবক -

রাত দশটা খড়মপাড়া গ্রামের
জন্য বেশ
অনেক রাত। ফইজু মেম্বার
ভাবে নাই
কাজ শেষ করতে করতে এত রাত
হয়ে যাবে।
কিন্তু এই এলাকার মাতবর সে।
চেয়ারম্যান
থাকে সদরে। তাই গ্রামের
বিচার আচার
আর শালিশ-দরবার সব ফইজু
মিঞাকেই সমলাতে হয়। দেখা যায় দরবার
শেষ হয়ে গেলেও অনেকে ঘিরে ধরে তাকে,
মিষ্টি পিচ্ছিল কথা বলে।
তো আজকেও
এমনি একটা বিচার ছিল।
প্রবাসী শ্রমিক
মনির হোসেনের স্ত্রী বেলায়াতীর
সাথে প্রতিবেশী আছির
মন্ডলের একটা গোপন
কচলাকচলি দেখে ফেলে ভাতৃবধু
সুফিয়া। তারপর হাকডাক,
কান্নাকাটি আর
ঝগড়া- ঝাটির পর আজকের এই শালিস।
এরই মধ্যে ফইজু মিঞার সমবয়সী আছির মন্ডল তলে তলে রসময় সমঝোতায়
চলে আসে তার সাথে।
শালিস শেষে বেলায়েতীর
সাবিত্রী রায় নিয়ে জনসমাগম
বাড়ী চলে যায়। আর
সাঝবেলা আধো আলো আঁধারে কি দেখতে কি দেখা আর
সেটা নিয়ে হাক ডাক করার জন্য তিরস্কৃত হয় সুফিয়া।
তারও আধা ঘন্টা পর ফইজু
মিঞা বুঝতে পারে আসলেই
বেলায়াতী বেশ উদার। তার
বাধানো তাগড়া শরীরেও হাপ
ধরে গিয়েছে এক দ্রুত
আপ্যায়নে। কাজ কাম শেষে বাড়ীর পথ
ধরে ফইজু মিঞা। ফটফটে জোস্না আছে, গ্রাম্য পথ
চলতে তেমন কোন সমস্যাই
হচ্ছিল না।
নিথর গভীর রাত, নুন্যতম শব্দহীন
সুনসান চরাচর।
তেল মারা বয়সী হারকিউলিস
সাইকেল প্যাডেলে প্যাডেলে সামান্য
কোঁকিয়ে উঠছে শুধু। ফজিুর
সারা শরীরে একটা আরামদায়ক
অবসাদ। তবে, নাপাক শরীরে একটু
অস্বস্তি লাগছে।
কারন গায়েবী মাখলুকাতগুলো নাপাক শরীরের গন্ধ পায়,
একা পেলে যা তা উৎপাত করে।
কার্তিকের মাঝরাত। ঝলক ঝলক
হিমেল হাওয়া প্রবাহিত
হচ্ছে মাঝে মধ্যে।

হঠাৎ একটা কালো বিড়াল হুস
করে রাস্তার
এপাশ থেকে ওপাশে দৌড়ে পার
হয়ে গেলো। আর একটু
হলে সাইকেলের নীচে চাপা পড়তো। ফইজু
মিঞা থামে।
লুঙ্গীর কোচ থেকে বিড়ি ম্যাচ
বের করে আগুন জ্বালায়। কষিয়ে টান
বসায়। কেমন যেন একটা অব্যক্ত
অস্বস্তি ফুটে উঠছে মনের পটে।
নাহ ! এত রাতে এমন একা একা বের
হওয়া ঠিক হয়
নি। আবজইল্ল্যা আসতে চেয়ে ছিল
সাথে। কিন্তু সাইকেলে ডাবলিং করার
হ্যাপায় তাকে ফিরিয়ে দিয়ে ছিল ফইজু।
এখন সামান্য আফসোস হচ্ছে। কেমন
যেন একটা বোবা ভয়
ধীরে ধীরে কুয়াশার
মত দলা পাকাচ্ছে অসম সাহসী ফইজু মিঞার গোটা অস্তিত্বকে কেন্দ্র করে।
পল পল করে পার হয় কিছু বোবা সময়।
উষ্ণ ঘাম বুক
গলা ভিজিয়ে দিচ্ছে তার।
একটা দিশেহারা ভাব
তাকে যখন গ্রাস করতে যাচ্ছিল ঠিক তখন দূর থেকে ভেসে আসলো কয়েকজন
মানুষের কন্ঠস্বর। উঠে দাঁড়িয়ে সরু চোখে তাকায়। তিনজন ছেলে বয়সী মানুষ আসছে। হঠাৎ
যেন কর্পূরের মত উবে গেল সব ভয়।
জাদরেলী হাঁক ছাড়লো,
কারা যায় ?
কাছে এসে পাশের গ্রামের যুবকদের
সলাজ উত্তর, বাজারের ভিডিও
দোকানে রাতের
বিদেশী ফিলিম
দেখে বাড়ী ফিরছে তারা। ফইজু
মিঞা সাইকেল
ঠেলে হাটতে থাকলো তাদের সাথে।
বেশ অনেকটা পথ এক
সাথে যাওয়া যাবে।
সংকোচিত যুবকদের
বিদেশী ফিলিম দেখার কুফল
বর্ণনা করতে করতে দিঘীর
পাড়ে পৌছে গেল। এবার
যুবকরা ভিন্ন
পথে যাবে। ফইজু মিঞার
বাড়ী এখান থেকে আর মাইলখানেক মাত্র।
চলে যাওয়া যাবে একটানে।
বিদায় নিল যুবকেরা।
তারা চোখের
আড়ালে যেতেই আবার স্বমহিমায় ফিরে এল
সেই পুরাতন ভয়।
যেন কাছাকাছি কোথাও
ঘাপটি মেরে লুকিয়ে ছিল এতক্ষন।
নিরিবিলি পেয়ে লাফিয়ে চেপে বসেছে ফইজু
মিঞার ঘাড়ে।সাইকেল
চালিয়ে আবার
রওনা হল দোটানায় পড়া ফইজু।
দিঘীর উঁচু পাড় থেকে নিচে নেমে গেছে রাস্তাটা। অনেক দূর পর্যন্ত প্যাডেল
মারতে হয় না। শুধু
হ্যান্ডেল ধরে বসে থাকলেই
হয়। জোরে জোরে কয়েকটি চাপ
দিয়ে পা দুটোকে জিরাতে দিল
ফইজু। ঝড়ের
বেগে সা সা করে ছুটে চলছে সাইকেল।
আরো কিছু
বাড়তি গতি দিতে সজোরে প্যাডেল
দাবায় ফইজু। হঠাৎ আবিস্কার
করে চেইন
পড়ে গেছে। হতাশ হয়ে সাইকেল
থেকে নামে সে। মনের
মধ্যে কেমন যেন
কু ডাকছে। বোধ হচ্ছে সাইকেল
থেকে নামাটা মোটেও ঠিক
হচ্ছে না,
কিন্তু কি আর করা। না,
চেইনটা পড়েনি । মাঝ বরাবর দুই খন্ড
হয়ে ছিঁড়ে গেছে!
বাকীটা পথ সাইকেল
ঠেলে নিয়ে যেতে হবে।
দিঘীর পাড়ের রাস্তার
দুপাশে ঘন ঝোপ ছিল, এখন
এখানটা একদম
পরিস্কার। সামনের দিকে যতদূর
দৃষ্টি যায় ধূ ধূ চরাচর।
সামনে হাশেম মুন্সীর পাথার। এই
বিস্তীর্ণ পাথারের পরই শুরু
হয়েছে ফইজুদের গ্রাম।
গ্রামের একেবারে মাঝামাঝিতে তার
বাড়ী । কিছু দূর যাবার পর ফইজু
মিঞা দেখলো মাটির রাস্তার উত্তর
পাশে বেশ কয়েকজন মানুষ
বসে আছে। আরো একটু
এগিয়ে গিয়ে দেখা গেল
দশ- বারো জন যুবক
বয়সী ছেলে রাস্তার
পাশে বসে দুলে দুলে কি যেন বই
পড়ছে।
পরনে লম্বা সাদা জামা আর
মাথায় গোল
টুপি। চারপাশটা কেমন যেন
একটা লালাচে আভায় আলোকিত
হয়ে আছে। এই কটকটে চাঁদের আলোয়
চেষ্টা করলে হয়তো কিছু
পড়া যায় কিন্তু
এতো জায়গা থাকতে রাস্তায়
বসে পড়াশুনা করতে দেখে ফইজুর
মেজাজ তিরিক্ষ হয়ে উঠলো।
কে রে তোমরা, এখানে কি কর ?
পিলে চমকানো হাঁক
ছাড়লো ফইজু মিঞা।
সবগুলো যুবক
শান্তভাবে এক
সাথে তাকালো ফইজু মিঞার দিকে। হঠাৎ
প্রান কেঁপে উঠলো
ফইজু মিঞার।

যুবকগুলোর চোখের জায়গায় যেন
গনগনে অঙ্গার বসানো। ধক্ব ধক্ব
করে জ্বলছে। লাল আলোয়
আলোকিত
হয়ে উঠেছে চারপাশ। কেমন যেন
একটা পোড়া পোড়া গন্ধ।
পড়া বন্ধ করে ধীরগতিতে নড়ে উঠে যুবকেরা।
যেন তার অপেক্ষাতেই বসে ছিল
এতো সময়।
বিস্ফোরিত চোখে ফইজু
দেখে চার হাত
পায়ে ভর করে দ্রুতগতিতে তার
দিকেই ছুটে আসছে তারা। ওওওরে….
বাবা গো……!
বলে উর্দ্ধশ্বাসে দৌড় দিল ফইজু মিঞা।
ঢেলায় আঘাত খেয়ে পায়ের নখ
উল্টে গেছে, কাদায়
পিছলা খেয়ে লুঙ্গী ছিড়ে গেছে,
কোন অনুভূতি নেই ফইজুর। যে কোন মূহুর্তে যেন ফেটে যাবে ফুসফুস। বাড়ীর
পেছনের ডেঙ্গা দিয়ে ট্টটি ও মুরগীর
ঘরের ফাঁক গলে দাওয়ায় আছড়ে পড়ে সে।

গোঁ গোঁ শব্দ করে হঠাৎ নীথর হয়ে যায় সে।
বাড়ীর লোকজন কুপি হারিকেন
নিয়ে বের হয়ে এসে দেখে চিৎ হয়ে পড়ে আছে নিস্পন্দন ফইজু মিঞার রাণহীন দেহ। চোখ দুটো আর
দাতের পাটিগুলো বিস্ফোরিত
ভাবে খুলে আছে। দাঁতের ফাক গলে বের
হয়ে আছে লম্বাটে শুষ্ক জিহবা।
মারা গেছে ফইজু মিঞা।
চেহারা দেখেই
বোঝা যাচ্ছে আলগা বাতাস
লাগা লাশ। কান্নার রোল উঠলো ফইজুর বউ
আর বাধা মুনীদের মাঝে।
আর্তনাদে যেন
চিরে দুই ভাগ
হয়ে যাবে কালো আকাশ। হিম শীতল
দেহটাকে গোসল
করালো পড়শীরা। নিঃসন্তান
ফইজু মিঞার জন্য বিলাপ করার জন্য
আধবুড়ো বউ
ছাড়া আর তেমন কেউ নেই। বউও
মূর্চ্ছা খেয়ে পড়ে আছে। তার
শুশ্রর্ষা করছে পাড়ার নারীরা।
সিদ্ধান্ত হলো আলগা বাতাস লাগা মরা লাশ কবর দিতে দেরী করা যাবে না।
রাত পোহালেই ফজরের নামাজ
শেষে জানাজা দিয়ে দেয়া হবে।
ফজরের নামাজ শেষ
পর্যায়ে লম্বা সালাম
দিয়ে ডানে বামে ঘাড়
ঘোরালেন ঈমাম
সাহেব। মুসল্লীরা অবাক
হয়ে দেখলেন
জামাতে শরীক
হয়েছে অপরিচিত দশ-
বারো জন যুবক।
তাদের আচার আচরন কেমন
যেন অদ্ভুত একটা মিল। সবাই যেন একজন
কিংবা একজনেরই
প্রতিচ্ছায়া সবাই। এপাড়া ওপাড়া বা আশেপাশের গ্রামের নয় এটা নিশ্চিত। কারন, এই এলাকার মানুষেরা এমন তুষার সফেদ জামা গায়ে দেয় না। এবার
জানাজা নামাজ। এক
কাতারে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নামাজ
পড়লো যুবকেরা।
জানাজা শেষে অন্যদের
একরকম জোর
করে সরিয়ে দিয়েই লাশের
খাটিয়া কাঁধে তুলে নিল চার যুবক।

তারপর হন হন করে হাঁটা ধরলো গোরস্থানের
দিকে। অন্ধকার ভোরে কোন মুসল্লীই
তাদের গতির সাথে তাল
মেলাতে পারছিল না। মসজিদের
বয়স্ক ঈমাম আর হাফেজ মুয়াজ্জিন
কিছু একটা সন্দেহ করতে লাগলো।
কিন্তু সবকিছু বুঝে উঠার আগেই শুণ্যে মিলিয়ে গেল লাশের খাটিয়া আর তার
বাহকেরা। কোথাও দেখা গেল না তাদের।
শুধু চারপাশ ম ম করছে আতর আর লোবান
পোড়া গন্ধে।
ফইজু মিঞার লাশ
আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় নি।